Gallery Images (4)
শিবপুর শিববাড়ি শিব মন্দিরের প্রাচীন ইতিহাস
বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলার ৬নং রাঢ়িপাড়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের বাগেরহাট-পিরোজপুর মহাসড়ক সংলগ্ন ফতেপুর-এর শিবপুর গ্রামে শিববাড়ি মন্দিরটির ইতিহাস বহু প্রাচীন। মন্দিরটি প্রতিষ্ঠার ইতিহাস আনুমানিক ৬০০ (ছয়শত) বছরের উর্ধ্বে। তবে ৬০০ বছরের পূর্বের কোন ইতিহাস বা প্রমাণ এখনও পর্যন্ত অজানা রয়ে গেছে। শিববাড়ি শুধুই প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটা একটা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনও বটে।
শিববাড়ি মন্দিরের প্রাচীন ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে চারটি (৪টি) বিষয়ের উপর নির্ভর করতে হয়। বইপত্র, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও জনশ্রুতি। প্রাচীন ইতিহাস নির্মাণে ঐতিহাসিকরা সাধারণত লিখিত ও
অলিখিত উপাদানের উপর নির্ভরশীল। সেই আলোকে আমরা শিববাড়ির ইতিহাস উন্মোচনের চেষ্টা করেছি। প্রথমত লিখিত উপাদানের মধ্যে
সর্বপ্রথম আমরা পাই ১৯১৪ সালে সতীশ চন্দ্র মিত্র রচিত বহুল সমাদৃত যশোহর খুলনার ইতিহাস গ্রন্থে। এই গ্রন্থটি তৎকালীন লেখকের সরেজমিন অনুসন্ধান ও গবেষণার ফসল। যশোহর-খুলনার ইতিহাস
গ্রন্থের বিভিন্ন পাতায় বিস্তারিত উল্লেখ আছে “খানজাহান আলী (রঃ) এর সময়কালে খাঞ্জেলী দিঘি (ঠাকুর দিঘি) খননকালে প্রাপ্ত বুদ্ধমূর্তিটি
শিবপুর (ফতেপুর) গ্রামে পূজিত হচ্ছে।” লেখকের বই-এ উল্লিখিত বিষয়ের আলোকে খানজাহান আলী (রঃ) সময়কাল সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।
অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতে, খানজাহান আলী (রঃ) পূর্ব পুরুষগণ তুর্কি জাতিভুক্ত ছিলেন। তিনি আনুমানিক ১৩৬৯ খ্রিস্টাব্দে দিল্লীতে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম জীবনে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। পরবর্তীতে যোগ্যতা বলে সেনাপতি পদে উন্নীত হন। সুলতানি আমলের দ্বিতীয় ইলিয়াস শাহীর সময়কালে আনুমানিক ১৫ শতকের প্রথম দিকে তিনি যশোরের বারোবাজার হয়ে দক্ষিণাঞ্চলের বাগেরহাট আগমন করেন। তিনি খুলনা, যশোর ও বাগেরহাটের অংশ বিশেষ নিয়ে এক আঞ্চলিক শাসন প্রতিষ্ঠা করেন যা খলিফাতাবাদ নামে পরিচিতি লাভ করেছিল। তিনি ছিলেন একাধারে যোদ্ধা, শাসক ও ধর্মপ্রচারক। ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি ৯০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। খানজাহান আলী (রঃ) দক্ষিণাঞ্চলে শাসন প্রতিষ্ঠার পর বহু জনহিতকর কাজ করেছিলেন। এর মধ্যে রাস্তা নির্মাণ, সরাইখানা স্থাপন ও মিঠা পানির দিঘি খনন উল্লেখযোগ্য অমরকীর্তি। বাগেরহাটের আশেপাশে ৬০০ বছরের পুরাতন এসব পুরাকীর্তির অনেকগুলি এখনও সমুজ্জ্বল রয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ততার জন্য মিঠা জলের অভাব প্রাচীনকাল থেকে অনুভূত হয়ে আসছে। খানজাহান আলী (রঃ)-এর অমরকীর্তি অত্র অঞ্চলে বহু মিঠা জলের দিঘি খনন, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য খাঞ্জেলী
দিঘি খনন যা ঠাকুর দিঘি নামেও পরিচিত।
খাঞ্জেলী দিঘির অবস্থান বর্তমান খানজাহান আলী (রঃ) মাজার সংলগ্ন। খাঞ্জেলী দিঘি (ঠাকুর দিঘি) খননকালে সেখানে কষ্টিপাথরের একটি
বুদ্ধ মূর্তি পাওয়া যায়। এই জন্যই খাঞ্জেলী দিঘি ঠাকুর দিঘি নামে অত্র অঞ্চলে ব্যাপক পরিচিত। ঠাকুর দিঘি নামে একটি মৌজার অবস্থানও তার প্রমাণ দেয়। ঠাকুর দিঘিতে প্রাপ্ত মূর্তিটি খননকালে
প্রাপ্ত সময় থেকে শিবপুরের শিববাড়িতে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত রক্ষিত ছিল ও পূজিত হয়ে আসছিলো। তাই আমরা খানজাহান আলী (রঃ)-এর আগমনের সময়কাল ধরে শিববাড়ির প্রতিষ্ঠার সময়কাল যে ৬০০ শত বছরের উর্ধ্বে তা বলতে পারি।
দ্বিতীয় মত, শত শত বছর ধরে দক্ষিণাঞ্চল তথা বাগেরহাটের আপামর জনসাধারণের মাঝে কিংবদন্তি বা জনশ্রুতি রয়েছে খানজাহান আলী (রঃ) এর সময়কালে খাঞ্জেলী দিঘি (ঠাকুরদিঘি) খননকালে প্রাপ্ত বুদ্ধমূর্তিটিই শিববাড়িতে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পূজিত হয়ে আসছিলো। মূলত প্রাপ্ত মূর্তির প্রস্তরখন্ডে শুধু বুদ্ধমূর্তিই ছিল না। এর সাথে শিবসহ হিন্দু অনেক দেব-দেবীর মূর্তিও উৎকীর্ণ ছিল। সতীশ চন্দ্র মিত্রের লেখা ‘যশোহর খুলনার ইতিহাস' গ্রন্থে শিববাড়িতে মূর্তি স্থাপনের ইতিহাস বিস্তারিত ভাবে উল্লেখ রয়েছে।
কচুয়া উপজেলার চরকাঠী গ্রাম নিবাসী মহেশ চন্দ্র ব্রহ্মচারী এক রাতে স্বপ্নাদেশ প্রাপ্ত হন যে, ঠাকুরদিঘি খননকালে প্রাপ্ত মূর্তিটি নিয়ে আসার জন্য। স্বপ্নে এও বলা হয় মূর্তিটি আনার সময় যেন কোথাও রাখা না হয়। স্বপ্নাদেশ মত মহেশ চন্দ্র ব্রহ্মচারী খানজাহান আলী (রঃ) কাছে গিয়ে উপস্থিত হন এবং তার স্বপ্নের কথা খুলে খানজাহান আলী (রঃ) মহেশ চন্দ্র ব্রহ্মচারীর সকল কথা শুনে বিশ্বাস করেন এবং মূর্তিটি তাকে নিয়ে যাবার জন্য অনুমতি প্রদান করেন। অনুমতি প্রাপ্ত হয়ে মূর্তিটি নিয়ে তিনি রওনা হলেন। পথিমধ্যে বিশ্রামের জন্য শিবপুরে বর্তমান শিব মন্দিরে মূর্তিটি রাখেন। পরবর্তীতে এসে ওই মূর্তিটি তুলতে গেলে আর তোলা বা উঠানো কোনক্রমেই সম্ভব হয়নি। তখন থেকেই মূর্তিটি শিববাড়িতেই ছিল। তখন সেখানে কোন লোকের বসতি ছিল না। ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মানুষেরা সেখানে আদি বাসিন্দা ছিলেন। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত মূর্তিটি শিববাড়িতে রক্ষিত ও পূজিত হচ্ছিল । কষ্টিপাথরের ওই মূর্তির ওজন প্রায় ৮৫ কেজি ।
যশোহর খুলনার ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে খানজাহান আলী (রঃ)-এর ৩৬০ বিঘা জমি ব্রহ্মোত্তর/দেবোত্তর হিসাবে দান করেছিলেন। কারো মতে, খানজাহান আলী (রঃ)-এর মৃত্যুর পর বাদশাহের পাঞ্জায় ৩৬০ বিঘা জমি নিষ্কর হিসেবে দান করেন।
তৃতীয় মত, সতীশ মিত্রের যশোহর খুলনার ইতিহাস গ্রন্থটিতে আরো উল্লেখ রয়েছে, শিবপুর শিববাড়িতে ঠাকুর দিঘিতে প্রাপ্ত মূর্তিটির প্রতিষ্ঠাতা মহেশ চন্দ্র ব্রহ্মচারী হতে শ্রী মন্মথনাথ এবং বিহারীলাল
ব্রহ্মচারী পর্যন্ত ১৬ পুরুষের বর্ণনা লিপিবদ্ধ রয়েছে। মহেশ চন্দ্ৰ ব্রহ্মচারী ছিলেন নিঃসন্তান। তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র শিবরাম ।
এই ১৬ পুরুষের সময় বা বয়সকাল অনুমান বা পর্যালোচনা করলে শিববাড়ির বর্তমান বয়স ছয়শত বছরের পুরাতন বলেই অনুমিত হয়।
চতুর্থ মত, চতুর্থ শতকে আমরা প্রত্নতাত্ত্বিক মত বলা যুক্তিযুক্ত মনে করতে পারি। মন্দিরটি নতুন রূপে সংস্কারের সময় গর্ভ মন্দিরের তলে অতি প্রাচীন
বিশাল এক প্রস্তর খন্ড পাওয়া যায়। এই প্রস্তর খন্ডটির ধরণ, অবয়ব, নকশা ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে অত্র অঞ্চলের ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা মনে
করেন প্রস্তর খন্ডটি সুলতানি আমলের খানজাহান আলী (রঃ)-এর সময় নির্মিত বিভিন্ন পুরাকীর্তিতে ব্যবহৃত প্রস্তরের সমসাময়িক। অবশ্য শিববাড়িতে প্রাপ্ত প্রস্তর খন্ডটির প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা এখনও সম্ভব হয়নি। প্রস্তর খন্ডটি এখনও মন্দির গৃহে সংরক্ষিত আছে।
উপরি উক্ত লিখিত বিষয়াদি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও জনশ্রুতির উপর নির্ভর করে আমরা সহজেই এ সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, শিববাড়ি প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ছয়শত বছরের অধিক পুরাতন। এ বিষয়ে বিজ্ঞ ব্যক্তিদের মধ্যে কোন দ্বিমত পরিলক্ষিত হয় না ।
সতীশ চন্দ্র মিত্র'র রচিত যশোহর খুলনার ইতিহাস গ্রন্থে সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে খানজাহান আলী (রঃ) শিবমন্দিরের জন্য ৩৬০ বিঘা জমি ও ব্রাহ্মণদের জন্য কিছু বৃত্তির ব্যবস্থার বিষয় উৎকীর্ণ প্রস্তর খন্ডটি
ব্রাহ্মণদের সমর্পণ করেছিলেন। আবার কারো মতে, শিবমন্দিরের জন্য খানজাহান আলী (রঃ)-এর মৃত্যুর পর গৌড়ের বাদশাহের জনৈক কর্মচারি এখানে এসে প্রত্যক্ষ শিবের চড়ক পূজায় উদ্ভুত অদ্ভুত বিষয়াদি দর্শন করে বাদশাহের পাঞ্জায় ৩৬০ বিঘা ভূমি নিষ্কর হিসেবে দান করেন।
একথা অসম্ভব নয়, কারণ খানজাহান আলী (রঃ)-এর মৃত্যুর কিছুকাল পরে হুসেন শাহ গৌড়ের সুলতান ছিলেন। তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি
অত্যন্ত সদয় ছিলেন। বাগেরহাটের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ছিল। তাঁর পুত্র নসরৎ শাহ কিছুদিন স্বয়ং বাগেরহাটে ছিলেন। সদাশয় হুসেন শাহ বা তাঁর পুত্র এই নিষ্কর ভূমি দান করে থাকতে পারেন।
অবশ্য বর্তমানে তাঁদের সেই দানের প্রমাণাদির কোন দলিল পাওয়া না যাবার কারণ স্বরূপ সেই সময়ে প্রচলিত সনদ, তাম্রনির্মিত ‘পাঞ্জা’র কথা বলা যায়। এই পাঞ্জা এই পরগণায় ভারতের প্রথম জরিপকালে ব্রহ্মোত্তর/দেবোত্তর প্রমাণের জন্য আদালতে দাখিল করা হয়েছিল। উল্লেখ্য পরে তা আর ফেরত আনা হয়নি।
এখানে উল্লেখ্য ভারতবর্ষের প্রথম জরিপে (S.A.) নিশ্চয়ই ওই সকল প্রমাণাদি দাখিল না করলে পরবর্তীতে S.A. পর্চায় ৬৪ একর জমি ব্রহ্মোত্তর/দেবোত্তর সম্পত্তি হিসাবে লিপিবদ্ধকৃত হত না ।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বপ্রথম ভূমি জরিপ শুরু হয় ১৮৮৫ সালের বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন অনুসারে
(১৮৮৭-১৯৪০)। এই জরিপ C.S. জরিপ নামে পরিচিত। এটাই সর্বপ্রথম ছাপানো পর্চা। এই C.S. পর্চায় স্পষ্টভাবে শিববাড়ির সকল সম্পত্তি শিবোত্তর (ব্রহ্মোত্তর/দেবোত্তর) সম্পত্তি হিসাবে উল্লেখ আছে।
জরিপের পর ওই সময়ের কাগজপত্রকে সম্পত্তির মূল ভিত্তি হিসেবে এখনও ধরা হয়ে থাকে ।
বিদ্রঃ-
রচনাঃ
শ্রী পার্থ দেব সাহা
প্রভাষক ইতিহাস
সরকারি ফকিরহাট ফজিলাতুন্নেছা ডিগ্রি মহাবিদ্যালয় ফকিরহাট-বাগেরহাট
এবং
প্রকাশক
শ্রী প্রদীপ বসু শন্তু
সভাপতি, শিব মন্দির কমিটি,
কচুয়া-বাগেরহাট
ঐতিহ্যের শিবপুর শিবমন্দির নামক প্রকাশিত বই থেকে আংশিক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
খুলনা বাগেরহাট বরিশাল রোডের শিবাড়ী মোড় সংলগ্ন শিবপুর শিববাড়ী মন্দির।
আপনার যদি এই মন্দিরের নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা কমিটির মোবাইল নম্বর অথবা অতিরিক্ত তথ্যের প্রয়োজন হয়, তবে সরাসরি আমাদের হোয়াটসঅ্যাপে নক দিন। Temple ID: #677581
Chat Now